ঘোষ গ্রামের মা লক্ষ্মী মন্দিরে পৌষ সংক্রান্তি উৎসব

রামপুরহাট থেকে সাঁইথিয়াগামী বাসটা মিনিট পঞ্চাশ সময় নিল আমাদের বীরচন্দ্রপুর পৌঁছে দিতে। এখান থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পুবে বীরভূম ও মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী ঘোষগ্রাম ‘মালক্ষ্মীর ধাম’ নামেই খ্যাত।

রামপুরহাট থেকে সাঁইথিয়াগামী বাসটা মিনিট পঞ্চাশ সময় নিল আমাদের বীরচন্দ্রপুর পৌঁছে দিতে। এখান থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পুবে বীরভূম ও মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী ঘোষগ্রাম ‘মালক্ষ্মীর ধাম’ নামেই খ্যাত। স্থানীয়জনের বিশ্বাস মালক্ষ্মীর এই গ্রাম হাজার বছরের অধিক প্রাচীন। ইতিহাস অবশ্য শোনায় ভিন্ন কথা—গৌড়েশ্বর আদিশূর কনৌজের কায়স্থ সোম ঘোষকে যে ভূ-সম্পত্তি দান করেছিলেন তার তালিকায় আমরা পাই ঘোষগ্রামের নাম। যদিও কিংবদন্তীমতে তারও আগে থেকে ছিল ঘোষগ্রাম ও লক্ষ্মী বিগ্রহের থান।

সে অনেককাল আগের কথা। ভরা বর্ষাকাল। গাঁয়ের পশ্চিমে বেড় দেওয়া কাঁদরটা (খাল) কানায় কানায় জলে ভরা। আগের দিন রাতভর তুমুল বৃষ্টির পর সকালটা সোনালি রোদে ঝলমল করছে। গাঁয়ের এক অখ্যাত চাষি দয়াল ঘোষের মনটা আজ খুশিতে ডগমগ।
বাপ-ঠাকুরদার মুখে সে শুনে এসেছে এক প্রাচীন প্রবাদ—
‘‘দিনে রোদ্দুর, রাতে জল
উনো গোছ, দুনো ফল।’’

কাঁদরের গায়ে ছোট জমিতে আজ দয়াল চাষ দিচ্ছে মহানন্দে। বছর আষ্টেকের ছোট ছেলেটা আজ তার পিছু নিয়েছে। পাশের জমিতে সেও খেলে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ দয়াল দেখল ছেলে উধাও; পাশের জমিতে তো নেই। চোখে পড়ল অনেক দূরে কাঁদরের বাঁকে ঝুঁকে পড়ে কী যেন তোলার চেষ্টা করছে সেই দামাল ছেলে। পা পিছলে পড়ে যাবে না তো খরস্রোতা কাঁদরের জলে। ভয় পেল দয়াল। হাল ফেলে এক ছুটে ছেলের কাছে এসে দেখে, বেশ বড় মাপের একটা শ্বেতপদ্ম ভেসে যাচ্ছে জলের টানে। ছেলেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে, কাপড় গুটিয়ে জলে নেমে পড়ল দয়াল ঘোষ। এ বার কিন্তু তার সত্যিকারের অবাক হবার পালা। মনে হচ্ছে কোনও অদৃশ্য হাত বুঝি সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেটা। আধ ঘণ্টার ওপর পদ্ম ধরার বৃথা চেষ্টা করার পর দয়াল উঠে পড়ল পাড়ে। মন কিন্তু পড়ে আছে স্রোতের টানে ভেসে যাওয়া সাদা পদ্মের দিকে।

এ দিকে না-পাওয়া পদ্মের শোকে ছেলে তো জুড়ে দিল কান্নাকাটি। মাথায় উঠল দয়ালের চাষবাস। কোনও রকমে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ছেলেকে নিয়ে ঘরে ফিরল। কিন্তু কারও কাছে পদ্ম-রহস্য প্রকাশ করতে কেমন যেন সঙ্কোচ হচ্ছে তার। সে রাতে স্বপ্ন দেখল দয়াল—সকালের অধরা পদ্ম অনেক বড় হয়ে এসেছে তার মাথার কাছে। আর সেই বিস্ময় মাখা ফুলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল মালক্ষ্মীর প্রসন্ন মুখমণ্ডল। স্বপ্নাদেশ হল—‘এই শ্বেত পদ্ম আমার প্রতীক। আমি তোর ওপর সন্তুষ্ট হয়েছি। তুই আমাকে প্রতিষ্ঠা কর এই গ্রামে। তোর খেতের পাশে যে নিমগাছ আছে তার তলায় দেখবি এক সাধু বসে আছে। তাকে আমার স্বপ্নাদেশের কথা জানাবি। যা করার সেই করবে।’

স্বপ্নের ঘোর ভাল করে কাটার আগেই ভোর হল। ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল দয়াল। ঘরের সকলে তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এক বুক অজানা আশঙ্কা বুকে নিয়ে পায়ে পায়ে দয়াল চলল তার জমির দিকে। আবছা আলোয় বেশ দূর থেকেই ঠাহর হল নিমতলায় কেউ একজন বসে আছে। কাঁপা গলায় সন্ন্যাসীকে দয়াল জানাল গতকালের পদ্মরহস্য ও শেষ রাতে দেখা দেবীর স্বপ্নের কথা। প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে সন্ন্যাসী জবাব দিলেন—‘কিছু ভাবিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ আশ্বস্ত হয়ে চুপিসাড়ে ঘরে ফিরে এল দয়াল ঘোষ। সন্ন্যাসীর প্রকৃত নাম কামদেব ব্রহ্মচারী। পরবর্তিকালে তাঁর ইচ্ছায় সেই নিমগাছ কেটে তৈরি হল লক্ষ্মীমূর্তি। দয়ালের জমির এক পাশে গড়ে উঠল মাটির আদি দেবী কুটির। সামনের কোজাগরী পূর্ণিমার দিন দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে কামদেব ব্রহ্মচারী নিত্যপূজার ভার গ্রহণ করলেন। বর্তমানে ইটের তৈরি মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ। ওদিকে বেশ কয়েক বছর সেবাপুজোর দায়িত্ব সামলানোর পর একদিন পথের টানেই বেরিয়ে পড়েছিলেন কামদেব ব্রহ্মচারী।

তখন সেবাপুজোর ভার পড়ল দু’ঘর ব্রাহ্মণ পরিবারের উপর। এদিকে দয়াল ঘোষের আর্থিক অবস্থার অনেক উন্নত হয়েছে। প্রতিদিনের পাঁচ সের দুধের পায়সান্ন ও রাতের ফল মিষ্টির জোগান সে অব্যাহত রাখলেও ধীরে ধীরে বাড়ছিল অহংকার বোধ। একদিন কী একটা ছোট ব্যাপারে পুরোহিতদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ার ফাঁকেই গর্ব করে বলে ফেলল—‘স্বপ্ন পেয়ে মায়ের মূর্তি ও ঠাকুরঘর আমি-ই করে দিয়েছি। আর এই ভোগের আয়োজন! এও তো মা আমাকে দিয়েই করাচ্ছেন।’ সে রাতে পুনরায় দেবী লক্ষ্মী দয়ালকে স্বপ্ন দিয়ে জানালেন—‘আমার স্বপ্নাদেশের কথা সেই সন্ন্যাসী ভিন্ন কাউকে বলতে বারণ করা সত্ত্বেও তুই গর্ব ভরে সবার সামনে বলেছিস। যদি বাঁচতে চাস এই গ্রাম ত্যাগ করে চলে যা। নইলে নির্বংশ হবি।’

অভিমানী দয়াল দেবীকে ছেড়ে গেলেন না। কিংবদন্তী বলে, হঠাৎ অসুস্থ হয়ে দয়াল এই দেবীর থানেই প্রাণ দিলেন। এরপর একে একে পরিবারের অন্য সদস্যরাও অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে থাকলে ঘোষেরা ত্যাগ করল এই গ্রাম। নামে ঘোষগ্রাম হলেও আজও এখানে দেখা পাবেন না ঘোষ পদবিধারী কোনও পরিবারের। পূর্বমুখী মন্দিরে প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর দাঁড়ানো লক্ষ্মীদেবীর দারু মূর্তিটি সুন্দর। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এটি কিন্তু দয়াল ঘোষের আমলের আদি মূর্তি নয়। ১৩৫৬ বঙ্গাব্দে মায়ের নবকলেবর অনুষ্ঠানের সময় সনকপুর গ্রামের দুই ছুতোর ভাই আদি মূর্তির অনুকরণে নির্মাণ করেন এই মূর্তিটি। লক্ষ্মী মন্দিরের দু’টি ঘর। জনশ্রুতি এই যে, দ্বিতীয় ঘরে রাম, লক্ষ্মণ, সীতা ও হনুমানের দারুমূর্তি সেই কামদেবের আমলের অর্থাৎ প্রায় হাজার বছরের বেশি প্রাচীন। লক্ষ্মী মন্দির প্রাঙ্গণে হালে গড়ে উঠেছে শিব ও সিদ্ধেশ্বরীর মন্দির।

নিত্য সেবাপুজো ছাড়া বৈশাখী পূর্ণিমা, ভাদ্র পূর্ণিমা, কোজাগরী পূর্ণিমা, চৈত্র পূর্ণিমা ও পৌষ মাসের প্রতি বৃহস্পতিবার মায়ের বিশেষ পুজো হয়। তবে বাংলার এই কিংবদন্তী লক্ষ্মী মন্দিরের সব চেয়ে বড় উৎসব আশ্বিন মাসের সংক্রান্তি বা ডাক সংক্রান্তিতে। একে নল সংক্রান্তিও বলা হয়। আশ্বিন মাসের সংক্রান্তির আগের দিন থেকে ২ কার্তিক পর্যন্ত বন্ধ থাকে মন্দিরে দরজা। বলা হয়, এই সময় মা বের হন জগৎ পরিক্রমা করতে। ওই চার দিন মায়ের বন্ধ ঘরে দিনরাত প্রদীপ জ্বলে। সংক্রান্তির আগের দিন সেই প্রদীপ থেকে ‘বর’ জ্বালিয়ে নেওয়া হয়। এরপর গ্রামের ঘরে ঘরে বিলি হয় ‘বর-এর ছাই’; আর ‘বর’-এর আগুন থেকে জ্বালানো হয় শত শত প্রদীপ। সংক্রান্তির দিন ভোরে চাষীরা প্রদক্ষিণ করে তাদের খেত বা ক্ষেত্র। প্রত্যেকের হাতে থাকে প্রস্ফুটিত শরদণ্ড। পরিক্রমার শেষে প্রত্যেকের জমির ঈশান সীমায় তিনটি গাছের পাতাকে সিঁদুরে রাঙিয়ে পুঁতে দেয় প্রস্ফুটিত শরদণ্ডগুলি। শরদণ্ডের সঙ্গে কাপড়ে বা পাতায় নৈবেদ্য বেঁধে দিয়ে তারা ভূমিলক্ষ্মীর কাছে অধিক ফলনের প্রার্থনা জানায়।
এত গেল খেতের দৃশ্য। এ দিকে চাষিদের বাড়িতে মেয়েরা স্নান সেরে কাচা কাপড় পরে গেয়ে ওঠে—

" আশ্বিন গেলো, কার্তিক এলো
ছোট বড় ধান গর্ভে এলো।
ধান রইল ভূঁয়ে,
যা শত্রু চলে যা, উত্তরদিক মুঁয়ে।।"

কার্তিক মাসের দু’তারিখে মন্দিরের বন্ধ দরজা খোলার পর অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ পুজো, হোম ও চণ্ডীপাঠ। এ বছর দোসরা কার্তিক কোজাগরী পূর্ণিমা পড়ায় ধুমধামের মাত্রা কিছু বাড়বে। সে দিন মন্দির প্রাঙ্গণে বসা মেলায় উপস্থিত হবে হাজার হাজার ভক্তজন। তারাপীঠ থেকে চুক্তিতে অটো ভাড়া করে অনায়াসে বছরভর বেড়িয়ে আসা যায় ঘোষগ্রামের কিংবদন্তী লক্ষ্মী মন্দিরে।